আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী হাফিজাহুল্লাহ এর দরদমাখা সতর্কবার্তা-

(এক)
———————————————————–
“আমাকে মুরব্বী মানার দরকার নাই, আকাবির বলারও দরকার নাই; তোমরা সালফে সালেহীনের নীতি-আদর্শ মুতালাআ’ কর, দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পড়, কাসেমী উসূল পড়, কাসেম নানূতবী ও রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর (রহিমাহুমুল্লাহ) জীবনী পড়, চিন্তাধারা মুতালায়া’ কর-
যদি তাদের নীতি-আদর্শের সাথে আমার কথার মিল পাও, তাহলে মানবে-অন্যথায় প্রত্যাখ্যান করবে।
উসূলের সাথে যদি মিল থাকে, আমার চেয়ে কমবয়সী আলেমের কথাও আমি মানতে রাজি আছি, আর মিল না থাকলে বেশী বয়সের মুরব্বীর আনুগত্যও সহীহ নয়- এটাই আকাবিরের নীতি।
আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ভুল থেকে ফিরে না আসলে অচিরেই কওমী ও সরকারী মাদরাসার পার্থক্য উঠে যাবে, প্রকৃত ইলম নি:শ্বেষ হয়ে রসমী ইলমের পরিবেশ তৈরী হবে, ঈমানী জযবাহ খতম হয়ে দুনিয়াবি চিন্তা গ্রাস করবে।
(মহান আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন)
হুকুমতের সাথে মাখামাখি থেকে এজন্যই আমাদের আকাবিরগণ দূরে থাকতেন- কারণ, এটার পরিণতি খুবই বিষাক্ত।
এটা তো হাদীসেও আছে,
وعن ابن عباس رضي الله عنهما ، قال : قال رسول الله – صلى الله عليه وسلم – : ” إن أناسا من أمتي سيتفقهون في الدين ويقرءون القرآن ، ويقولون : نأتي الأمراء فنصيب من دنياهم ونعتزلهم بديننا . ولا يكون ذلك ، كما لا يجتنى من القتاد إلا الشوك ، كذلك لا يجتنى من قربهم إلا – قال محمد بن الصباح : كأنه يعني – الخطايا ” . رواه ابن ماجه .
অর্থাৎ রাসূল স. বলেন, আমার উম্মতের একদল লোক দ্বীনি ইলম অর্জন করবে, কুরআন পড়বে আর বলবে, আমরা তো শাসকদের দরবারে যাই আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য-কিন্তু আমাদের দ্বীনকে হেফাজত করি (আদর্শ ঠিক রাখি)…
এটা কখনো সম্ভব নয়; যেমব কাঁটাদার গাছ থেকে কাঁটা ছাড়া অন্যকিছু আশা করা যায়না।
একইভাবে শাসকদের সাথে সম্পর্ক দ্বারা আল্লাহর নাফরমানি অর্জন ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায়না।”
সুনানে ইবনে মাজাহ-পৃ:23

———————————————

(দুই)
—————————————————–
” হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা কাসেম নানূতবীর (রহ.) কাছে এক প্রদেশের নবাব (সম্ভবত:ভূপালের, আমার ঠিক মনে নেই) বেশ কয়েকবার সাক্ষাত করার আবেদন জানানোর পর স্বল্প সময়ের জন্য সাক্ষাতের সুযোগে দিলেন।
আলাপ-আলোচনার পর ঐ নবাব হজরতকে এক থলে মুদ্রা হাদিয়া দিতে চাইলে- তিনি তা কঠিনভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন। মাদরাসার জন্য দিতে চাইলে বললেন, সরকারী লোক, ধনাঢ্য প্রভাবশালীদের সহযোগীতা গ্রহণ আমার মাদরাসার (দেওবন্দ) উসূল-পরিপন্থী।
ঐ বেচারা বারবার অনুরোধ জানিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর ঐ মুদ্রাগুলো হজরতের অজান্তে হজরতের জুতার ভেতর ভরে দিয়ে চলে গেলেন।
নামাজান্তে হজরত নানূতবী বের হয়ে তা দেখে জুতা না পরেই রুমে চলে গেলেন এবং একজনকে বললেন, হায় আমার জুতায় তো দুনিয়া ঢুকেছে, তুমি আমার জুতাগুলো দুনিয়ামুক্ত করে নিয়ে আস। ঐ খাদেম গিয়ে জুতা থেকে মুদ্রাগুলো বের করে ফকির-মিসকীনদের দিয়ে দিলেন এবং জুতা এনে হজরতকে দিলেন…
أولئك آبائي فجئني بمثلهم – إذا جمعتنا يا جرير المجامع…

আফসোস-আজকে আমরা তো নিজেরাই ধর্ণা দিচ্ছি প্রভাবশালীদের কাছে, সরকার ও প্রশাসনের দরবারে। তাদের কাছে গিয়ে হক কথা বলছিনা; বরং মুহতাজি জাহের করছি, অতিরিক্ত তোষামোদ করছি!

এর সুযোগে ওরা মাদরাসায় সহযোগিতা তো কিছু করছে কিন্তু এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশী সুবিধা আদায় করছে, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মাদরাসার ব্যাপারে প্রভাব বিস্তার করছে, অবৈধ হস্তক্ষেপ করছে।
এভাবেই আমরা কাসেমী উসূল থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আর পরিণতিতে মাদরাসার মৌলিক রূহ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যথাযথভাবে হক কথা বলতে পারছিনা, সরকার ও বড় লোকদের ইসলামবিরোধী বক্তব্য ও কাজের প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলছি।
এভাবে হলে আর এ মাদরাসাগুলো দেওবন্দী মাদরাসা থাকবেনা আর দারুল উলুম দেওবন্দের অন্যতম লক্ষ্য – এ’লায়ে কালিমাতুল্লাহর চেতনা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে, কুফরী আগ্রাসন প্রতিরোধ করার জন্য আর কোন জামাত থাকবেনা। আফসোস।
এখনো সময় আছে, আমরা সতর্ক হই, কাসেমী সন্তানদেরকে কাসেমী চেতনায় ফিরিয়ে নিয়ে আসি…”
———-
(তিন)
—————————————————–

অনেকেই বলছেন, আমরা স্বীকৃতির পক্ষে, সংবর্ধনার বিপক্ষে-
আমি কিন্তু শুরু থেকে স্বীকৃতিরই বিরোধিতা করে আসছি।
কারণ, আমি আগে থেকেই অনুভব করেছি, আমাদের একটি দাবীও যারা মেনে নেয়নি; উপরন্তু হামলার মাধ্যমে আমাদের সমাবেশকে বাঞ্চাল করেছে, হঠাৎ করে তারা স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য পাগলপারা হয়ে উঠল কেন!
অবশ্যই এখানে অন্তর্নিহিত কোন দূরভিসন্ধি আছে।
যারা স্বীকৃতির ধাঁধাঁয় পড়ে তের দফার বিষয়কে উপেক্ষা করতে পেরেছে, তারা পরবর্তীতে অটল থাকতে পারবেন-এটা কীভাবে আস্থা রাখা যায়!
তাই আমি শুরু থেকেই কথিত স্বীকৃতির বিরোধিতা করে আসছি। কিন্তু আমার কথাকে আমলে নেওয়া হলোনা, এখন মুরব্বীকে ভুল বুঝিয়ে আত্মমর্যাদা বিসর্জনের পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
একটা বিষয়ে ভুল ভাঙ্গতে হবে, স্বীকৃতি কখনোই আমাদের প্রাণের দাবী ছিলনা; তের দফাই ছিল প্রাণের দাবী- হঠাৎ করে নতুন শ্লোগান কোত্থেকে উদ্ভব হল জানিনা।
একসময় দুয়েকজন আলেম ছাড়া সবাই স্বীকৃতির কট্টর বিরোধী ছিলেন- এখন দেখছি, একে একে সকলেই নমনীয় হয়ে পড়ছেন- যার পরিণতিতে আরো অমার্যাদাকর পথে পা বাড়াতে হচ্ছে।
সবাই মিলে স্বীকৃতি নিচ্ছিল, আমি আর বাধা হয়ে দাঁড়াইনি; কিন্তু এখন তো আরো বহুদূরে এগিয়ে যাচ্ছেন তারা। এজন্যই উসূলকে গুরুত্ব দিতে হয়, বুঝে-শুনে পা বাড়াতে হয়।
খুব ভাল করে খেয়াল করলে বুঝা যাবে-
স্বীকৃতির মাধ্যমেই আমাদেরকে তের দফা থেকে সরিয়ে এনে স্বীকৃতিমুখী করে দেওয়া হয়েছে।
যার ফলে হেফাজতের মূল চেতনার আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল আর আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্নদিকে প্রবাহিত হল।
ফলে শহীদদের জন্য দুআ’ করার সময়টাও এখন আমাদের হয়না। হায় আফসোস!

স্বীকৃতি যদি জরুরতের কারণে নিতে হয়, তাহলে তের দফার ফরজ বাদ দিয়ে কেন, আত্মসমর্পনকে মেনে নিয়ে কেন! বিষয়গুলো আগেভাগে ভাবলে আশা করি কেউ স্বীকৃতির কথা ভাবতেননা।
কথাগুলো আমি সবাইকে বলেছি, এককভাবেও বলেছি, জমায়েতেও বলেছি-সামনাসামনি সবাই মেনে নেয়;কিন্তু পরে দেখি সিদ্ধান্ত আসে এর বিপরীত। এখন বলারও তো সুযোগ নেই; দীর্ঘদিন ধরে আমাকে ডাকাও হয়না, মাশওয়ারাও নেওয়া হয়না।
মনের দু:খ থেকে বলছি, আমি ক’দিন বেঁচে থাকি জানিনা- মনের একটা ব্যাথা, আমরা তো মনে হচ্ছে আকাবিরের আমানতকে নষ্ট করতে যাচ্ছি!
আল্লাহ তায়া’লা সকলকে সহীহ পথে আসার তাওফিক দান করুন।

©Muhammad Helaluddin

Image may contain: 1 person, beard